শরীরকে রোগমুক্ত আর ত্বককে আকর্ষণীয় করতে থানকুনি পাতা!

থানকুনি পাতা। আমাদের দেশের খুব পরিচিত একটি ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। এর ল্যাটিন নাম centella aciatica। গ্রামাঞ্চলে থানকুনি পাতার ব্যবহার আদি আমল থেকেই চলে আসছে। ছোট্ট প্রায় গোলাকৃতি পাতার মধ্যে রয়েছে ওষুধি সব গুণ। থানকুনি পাতার রস রোগ নিরাময়ে অতুলনীয়।প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বহু রোগের উপশম হয় এর ভেষজ গুণ থেকে। খাদ্য উপায়ে এর সরাসরি গ্রহণ রোগ নিরাময়ে থানকুনি যথার্থ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। অঞ্চলভেদে থানকুনি পাতাকে আদামনি, তিতুরা, টেয়া, মানকি, থানকুনি, আদাগুনগুনি, ঢোলামানি, থুলকুড়ি, মানামানি, ধূলাবেগুন, নামে ডাকা হয়। তবে বর্তমানে থানকুনি বললে সবাই চেনে।

 

উপকারিতা

রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখেঃ  অতিরিক্ত টেনশনের কারণে কি ব্লাড প্রেসার ওঠা-নামা করছে? তাহলে আজ থেকেই থানকুনি পাতা খাওয়া শুরু করুন। কারণ এই শাকটি রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে ব্লাড প্রেসার হঠাত্‍ বেড়ে যাওয়ার কারণে যাতে কোনও ধরনের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখে।

ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়েঃ বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত কয়েকটা করে থানকুনি পাতা মুখে নিয়ে চেবালে ধীরে ধীরে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। তাই তো ব্রঙ্কাইটিস, বুকে কফ জমা এবং সাইনাসের মতো সমস্যা কমাতে এই প্রাকৃতিক উপাদানটি দারুন কাজে আসে। এবার বুঝেছেন তো নিয়মিত এই শাকটি খাওয়ার প্রয়োজন কতটা!

চুল পড়াঃ অপুষ্টির অভাবে, ভিটামিনের অভাবে চুল পড়লে পুষ্টিকর ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ৫-৬ চা চামচ থানকুনি পাতার রস দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হবে। চুল পড়া আটকায় থানকুনি পাতা ৷ এমনকী, থানকুনি পাতার রস রোজ মাথায় লাগালে নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে ৷

বুদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তি বাড়েঃ বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে থানকুনি উপস্থিত বেশ কিছু কার্যকরি উপাদান শরীরে প্রবেশ করা মাত্র ব্রেনের হিপোকম্পাস অংশটির ক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে বুদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তি চোখে পড়ার মতো বাড়তে শুরু করে। প্রসঙ্গত, মনোযোগ বাড়াতেও এই শাকটি বিশেষ ভূমিকা নেয়। কারণ ব্রেনের হিপোকম্পাস অংশটির ক্ষমতা বাড়ছে না কমছে, তার উপর মনোযোগের বাড়া-কমা অনেকাংশেই বৃদ্ধি পায়।

ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমেঃ এই শাকটিতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই উপাদানটি শরীর থেকে নানাবিধ ক্ষতিকর উপাদানদের বার করে দিয়ে একদিকে যেমন ক্যান্সার সেলের জন্ম আটকায়, তেমনি সার্বিকভাবে শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। সেই কারণেই তো সুস্থ জীবন পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে থানকুনি পাতার সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটা জরুরি।

দেহের অন্দরে প্রদাহ কমায়ঃ বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে শরীরের কোনও জায়গায় কেটে যাওয়ার পর ক্ষতস্থানে থানকুনি পাতা বেঁটে লাগালে জ্বাল-যন্ত্রণা একেবারে কমে যায়। শুধু তাই নয়, নিয়মিত এই শাকটি খেলে শরীরের অন্দরে তৈরি হওয়া ইনফ্লেমেশনও কমে যেতে শুরু করে। ফলে কমে আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা।

স্ট্রেস এবং অ্যাংজাইটির মাত্রা কমায়ঃ একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত এই পাতাখেলে মস্তিষ্কের অন্দরে স্ট্রেস এবং অ্যাংজাইটির জন্ম দেওয়া কর্টিজল হরমোনের ক্ষরণ কমতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপ যেমন কমে, তেমনি মনের হারিয়ে যাওয়া অনন্দও ফিরে আসে। প্রসঙ্গত, আজকের দিনে ছাত্র-ছাত্রী হোক কি চাকরিজীবী, সকলেই নানা কারণে বেজায় মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। ফলে ডিপ্রেশনের মতো মানসিক রোগের খপ্পরে পরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে থানকুনি পাতা খেলে কতটা উপকার মিলতে পারে, তা নিশ্চয় আর বলে দিতে হবে না।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি ঘটেঃ নিয়মিত এই শাকটি খাওয়া শুরু করলে শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি-এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জোরদার করে তুলতে সাহায্য করে। আর একবার ইমিউনিটি বেড়ে গেলে কোনও ধরনের সংক্রমণ তো ধারে কাছে ঘেঁষতে পারেই না, সেই সঙ্গে আরও নানাসব রোগ দূরে পালাতেও বাধ্য হয়।

লাবণ্যতাঃ যদি মুখ মলিন হয়, লাবণ্যতা কমে যায় তবে ৫-৬ চা চামচ থানকুনি পাতার রস দুধ দিয়ে খেতে হবে। নিয়মিত করলে উপকার পাবেন।

অ্যালঝাইমার রোগকে দূর রাখেঃ এই পাতায় উপস্থিত ব্যাকোসাইড নামক এক ধরনের বায়ো-কেমিকাল ব্রেন টিস্যুর ক্ষত সারিয়ে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্রেন পাওয়ার কমে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন কমে, তেমনি কগনিটিভ ফাংশন কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে।

কাশির প্রকোপ কমেঃ ২ চামচ থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে অল্প করে চিনি মিশিয়ে খেলে সঙ্গে সঙ্গে কাশি কমে যায়। আর যদি এক সপ্তাহ খেতে পারেন, তাহলে তো কথাই নেই। সেক্ষেত্রে কাশির কোনও চিহ্নই থাকবে না।

হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটেঃ থানকুনি পাতা হজম ক্ষমতারও উন্নতি হবে। কারণ একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে থানকুনি পাতায় উপস্থিত একাধিক উপকারি উপাদান হজমে সহায়ক অ্যাসিডের ক্ষরণ যাতে টিক মতো হয় সেদিকে খেয়াল রাখে। ফলে বদ-হজম এবং গ্যাস-অম্বলের মতো সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না।

 

Similar Posts

  • যে কারণে সবার মাছ খাওয়া উচিত

    প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্য আমাদের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। একজন মানুষের সারাদিনের ক্যালরি চাহিদার ২০-৩০% প্রোটিন জাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত। অনেকেই ভাবেন, প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্যের ভাল উৎস মানেই কেবল মাংস। অথচ মাছ থেকে যে মাংসের সমান পুষ্টি পাওয়া যেতে পারে,অনেকে হয়ত এই ধারনাটি মানতে চান না।মাংস এবং মাছ দুটোই হল প্রথম…

  • |

    ডিমের খোসার উপকারিতা জানেন কী?

    ডিম খেতে পচ্ছন্দ করেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ডিমে খুব সহজেই প্রোটিন পাওয়া যায়। শিশুরাও অন্যান্য খাবারের চেয়ে ডিম বা ডিম দিয়ে তৈরি খাবারই বেশি পছন্দ করে। শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, রূপচর্চা সহায়ক উপাদান হিসেবেও প্রত্যেক গৃহস্থের ঘরে ডিম থাকে। ডিম দিয়ে তৈরি নানা খাবারের কথা তো আমরা জানি। কিন্তু ডিমের খোসাও যে…

  • ডাক্তার থেকে দূরে রাখবে আপেল!

    খুব পরিচিত ফল আপেল। কিন্তু আমরা বেশিরভাগই এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানি না। প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে দূরে থাকবে অনেক রোগ। আপেলে রয়েছে ৯৫ ক্যালরি, ২৫ গ্রাম কার্ব, ৪ গ্রাম ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাংগানিজ, কপার, ভিটামিন বি১, বি২, বি৬, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং ভিটামিন কে। এছাড়া আপেল ভিটামিন ই এর অন্যতম উৎস।  …

  • ফল খাওয়ার সঠিক সময় কখন?

    সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু—সব ক্ষেত্রেই ফল উপকারী খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। ফল হলো প্রকৃতি-প্রদত্ত এক আশীর্বাদ। এটি সুস্বাদু ও সহজপ্রাপ্য। তবে এই আশীর্বাদ অভিশাপে রূপ নেয়, যদি এটি গ্রহণের সময় ও পদ্ধতি সঠিক না হয়। প্রায় সবার মাঝেই একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো, ফল যেকোনো সময় কেটে খাওয়া যায়। কিন্তু ফল গ্রহণের সুনির্দিষ্ট সময় অনুসরণ করা না হলে…

  • যেসব কারনে খাবেন ইসুবগুলের ভুসি

    ইসবগুল বা psyllium husk বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক দেশেই বেশ পরিচিত। ইসুবগুল ‘গুল্ম’ জাতীয় গাছ। এর ফুল ছোট,পাপড়ি সূক্ষ হয়। বীজের খোসা আছে। ইসুবগুল গাছের উচ্চতা দেড়-দুই ফুটের পর্যন্ত লম্বা হয়। ফল দুইকোষ বিশিষ্ট, ৭-৮ মিলিমিটার লম্বা হয় এবং ফলের ভিতরে ৩ মিলিমিটার লম্বা বীজ থাকে। বীজ দেখতে নৌকার মতো এবং এর খোসায় পিচ্ছিল হয়। এটা…

  • মেথির ম্যাজিক

    মেথি বা Fenugreek যার বৈজ্ঞানিক নাম Trigonella foenum-graecum।মেথি হচ্ছে একটি  ভেষজ মৌসুমী গাছ। আমরা সকলেই মেথি চিনি।  মেথিকে মসলা, খাবার, পথ্য—তিনটিই বলা চলে। মেথির স্বাদ তিতা ধরনের।   ১. ওজন কমাতে প্রাকৃতিক ফাইবার থেকে জন্ম নেয় মেথি। মেথি  চিবিয়ে গিলে খাওয়া যায় এবং পাকস্থলীর ফাঁকা স্থান মেথি  পূর্ণ করে। মেথি  ওজন কমাতে সাহায্য করে। খুব বেশি নয়, সপ্তাহে যদি…

Leave a Reply