সকল রোগের মহৌষধ কালোজিরা

আমরা সবাই জানি কালোজিরা দরকারি মসলা। প্রায় অনেক রান্নাতেই স্বাদ তৈরি করতে রোজই ব্যবহার হয় এটি। অথচ পুষ্টিবিদ ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু রান্নায় স্বাদ যোগ করাই এর একমাত্র কাজ নয়। বরং প্রতিদিনের পাতে উপস্থিত থেকে শরীরকে নানা অসুখের সঙ্গে লড়তেও সাহায্য করে।  কালোজিরা একটি মাঝারি আকৃতির মৌসুমী গাছ, একবার ফুল ও ফল হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nigella Sativa Linn। এর স্ত্রী, পুরুষ দুই ধরনের ফুল হয়, রং সাধারণত হয় নীলচে সাদা, পাঁচটি পাঁপড়ি বিশিষ্ট । কিনারায় একটা বাড়তি অংশ থাকে। তিন-কোনা আকৃতির কালো রং এর বীজ হয় । গোলাকার ফল হয় এবং প্রতিটি ফলে ২০-২৫ টি বীজ থাকে ।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন: “ তোমরা কালোজিরা ব্যবহার করবে, কেননা এতে একমাত্র মৃত্যৃ ব্যতীত সর্বরোগের মুক্তি এতে রয়েছে”।–

আসুন আমরা জেনে নেই আমাদের জন্য কি কি ঔষধী গুণ আছে এই কালোজিরাতে।

১.স্তন্যস্বল্পতা : পেটে আমদোষ থাকলে অথবা শরীরের রসধাতু শুকাতে থাকলে স্তন্য কমে যায়। এ সময় কালোজিরা সামান্য ভেজে গুঁড়ো করে খেতে পারেন বা অনেকেই এভাবে খেতে পছন্দ করে না তারা কালো জিরার আচার ভাতের সাথে খেতে পারেন সকালে ও রাতে সাত দিন ধরে খেলে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়।

২.মাসিক ঋতু : যেসব মহিলা অনিয়মিত অথবা স্বল্প অথবা অধিক স্রাবের জন্য কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাদের ঋতু হওয়ার পাঁচ-সাত দিন আগে কালো জিরার আচার ভাতের সাথে খেতে পারেন।

৩.বাধক দোষ : এ দোষ হলে মেয়েরা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, কেউবা আত্মসুখে তৎপর থাকে, কেউবা শূচীবায়ুগ্রস্ত হয়, কারো কারো দেহটা স্থূল হয়ে যায় আবার কখনো বা তা হয় না।

আবার সবাই যে শুকিয়ে যাবে, তাও নয়। কিন্তু মনের ওপর এ রোগের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর ফলে কেউ কেউ কামজ উন্মাদ রোগেও আক্রান্ত হয়। আবার এ দোষে কোনো কোনো মহিলা জননগ্রন্থির ক্রিয়াশক্তি হারিয়ে ফেলে।

সেই সাথে আরো অনেক উপসর্গ এসে জোটে। এ ক্ষেত্রে কালোজিরা সামান্য ভেজে নিয়ে গুঁড়ো করে সকালে ও সন্ধ্যায় ৭৫০ মিলিগ্রাম মাত্রায় খেতে হয় এবং তা মাসিকেও খেতে হবে। এভাবে ২-৩ মাস খেলে রোগের উপশম হবে।

৪.গর্ভাশয়ের দ্বার সঙ্কোচন : প্রসবের পর কালোজিরার ক্বাথ খেলে গর্ভাশয়ের দ্বার সঙ্কুচিত হয় এবং সেই সাথে স্তন্য বাড়ে।

৫.কক্টরজ ও ঋতুরোধ : অল্প মাত্রায় কালোজিরা মেয়েদের ঋতুস্রাব বাড়ায়, কষ্টরজ ও ঋতুরোধ অসুখ সারায়। তবে বেশি মাত্রায় খেলে গর্ভস্রাব হয়।

৬.মাথায় যন্ত্রণা : কাঁচা সর্দি হয়ে মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কালোজিরা পুঁটলিতে বেঁধে শুঁকতে হবে। তবে পুঁটলিতে নেয়ার আগে তা রগড়ে নিতে হবে। তাতে গন্ধ বের হয় এবং উপকার হয়। তা ছাড়া সির্কাতে ভিজিয়ে শুঁকলেও মাথাব্যথা সারে।

৭.মাথায় সর্দি বসা (শ্লেষ্মা বসে যাওয়া) : এ অবস্থায় কালোজিরা বেটে কপালে প্রলেপ দিলে ও মিহি গুঁড়োর নস্যি নিলে উপকার হয়।

৮.নতুন সর্দি : এ অবস্থায় কালোজিরার নস্যি নিলে উপকার মেলে।

৯.চুলকানি : কালোজিরা ভাজা তেল গায়ে মাখলে চুলকানিতে উপকার হয়। এতে ১০০ গ্রাম সরষের তেলে ২৫-৩০ গ্রাম কালোজিরা ভেজে সে তেল ছেঁকে নিয়ে ব্যবহার করতে হয়।

১০.বিছের হুলের জ্বালা : কালোজিরা বেটে তা লাগিয়ে দিলে অল্প সময় পরই হুলের জ্বালা কমে যায়।

১১.গলা ফোলা : সর্দি-কাসির দোষে গ্লান্ড ফুলেছে, সে ক্ষেত্রে কালোজিরা, চাল পোড়া, মুসাববর সমান পরিমাণে নিয়ে বেটে প্রলেপ দিলে এক দিনের মধ্যে ফোলা ও ব্যথা উভয়ই উপশম হয়।

১২.শোথ : পানিতে কালোজিরা বেটে প্রলেপ দিলে হাত-পা ফোলাসহ সব শোথ কমে।

১৩.দাঁতের ব্যথা : গরম পানিতে কালোজিরা নিয়ে তা দিয়ে কুলি করলে দাঁতের ব্যথার উপশম হয়।

১৪.দাদ : কালোজিরা বেটে প্রলেপ দিলে এসবে উপকার হয়। তা ছাড়া ওপরে উল্লিখিত চুলকানির নিয়মে দিলে আরো ভালো হয়।

১৫.ধবল : কালোজিরা বেটে প্রলেপ দিলে এসবে উপকার হয়। তা ছাড়া ওপরে উল্লেখিত চুলকানির নিয়মে দিলে আরো ভালো হয়।

১৬.নতুন চুল গজানো : কালোজিরা বেটে নিয়ে মাথায় অনেক দিন ধরে মালিশ করলে নতুন চুল গজায়।

১৭.লাবণ্য : ঘিয়ের সাথে মিশিয়ে খেলে মুখ উজ্জ্বল হয় ও রং ফর্সা হয়।

১৮.সন্তান প্রসব : কালোজিরা পানিতে সিদ্ধ করে খেলে সন্তানের প্রসব তাড়াতাড়ি হয়।

১৯.কৃমি : ভিনেগারে ভিজিয়ে কালোজিরা খেলে কৃমি নষ্ট হয়।

২০.স্মৃতিভ্রংশ : স্মৃতিভ্রংশ ও স্মরণশক্তির দুর্বলতায় কালোজিরা খুব কার্যকর। ৩ গ্রাম কালোজিরা ২০ মিলিলিটার বিশুদ্ধ মধুসহ চাটলে এ রোগ সারে।

২১.জন্ডিস, প্লীহাবৃদ্ধি, ২৩. শূল ব্যথা, বুকের ব্যথা, বমনেচ্ছা : কালোজিরা বেটে খেলে এসব রোগ সারে। সেই সাথে বাটা গায়েও মালিশ করতে হয়।

২২.প্রস্রাবের বাধকতা : পরিমাণমতো কালোজিরা খেলে প্রস্রাব পরিষ্কার হয়ে যায়।

সবাই মিলে ভেষজ ব্যবহার বাড়ালে এবং মানুষের মধ্যে প্রচার করলে আদি, অকৃত্রিম ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচা যাবে।

Similar Posts

  • পুষ্টিগুণে বরই সেরা

    দেশি ফলের মধ্যে বরই বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে আমাদের দেশে নানা জাতের বরইয়ের চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে নারকেল বরই, আপেলকুল, বাউকুল, থাইকুল আর দেশি টক বরই তো আছেই। বরই খেতে ভালোবাসেন কম বেশি সবাই। টক-মিষ্টি এই ফলটির রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। পুষ্টিগুণ ছাড়াও এর রয়েছে অনেক রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা। অবসরে বরইয়ের আচার সঙ্গ দেয় মনকাড়া আস্বাদনে।...
  • আমের যত উপকারিতা

    আমকে বলা হয় ফলের রাজা। কেবল স্বাদে মিষ্টি বা ত্বককে ভালো রাখাই নয়, এর মধ্যে রয়েছে এমন অনেক পুষ্টিগুণ যা শরীরকে ভালো রাখে। সারা বিশ্বে প্রায় এক হাজার প্রজাতির আম রয়েছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে হিমালয়ের আশপাশের সমতলভূমিতে এ ফলটি আবিষ্কৃত হয়েছিল। আম কি: আম, ভারতীয় উপমহাদেশীয় এক প্রকারের সুস্বাদু ফল। কাঁচা অবস্থায়...
  • আমের ফলি বা আমচুর দিয়ে টক মিষ্টি ঝাল আচার

    ফলের রাজা আম।  আমাদের দেহে আম রাজার মতোই কাজ করে থাকে।  আম শুধুমাত্র একটি সুস্বাধু ফলই নয়, এটি স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি কমাতে ওষুধের কাজও করে।আমে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, ভিটামিন বি, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ভিটামিন এ বা বিটা ক্যারোটিন।গবেষণায় দেখা গেছে, আম খাওয়ার ফলে স্থুলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। এছাড়া ত্বক ও চুলের রঙের পরিবর্তনের...
  • আমের ফলি দিয়ে মজাদার আমচুর

    অনেকেই ভাবেন, আম এতটাই মিষ্টি যে তা খেলে শরীরের ওজন বেড়ে যায়। কিন্তু জানেন কি, এই ফলের রাজা কিন্তু আপনার চর্বি গলিয়ে দিতে খুবই ভাল কাজ করতে পারে।আমে রয়েছে ভরপুর নিউট্রিশন আর এটি ফাইবারে পরিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আম খেলে দীর্ঘ সময় খিদে পায় না। এতে থাকা ফাইবারই পেট ভরিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আমে আরো রয়েছে...
  • নাগা মরিচের অসম্ভব ঝাল কিন্তু ঘ্রাণটা লাগে বেশ!

    দুনিয়াতে সম্ভবত মরিচই এক মাত্র ফল যা কামড়ালে পাল্টা কামড় দেয়। এই পাল্টা কামড়ের প্রতিক্রিয়া মরিচের জাতভেদে নানা ধরনের হতে পারে। কোনটা কামড় দেয়ার সাথে সাথে মুখের ভিতর জ্বালা শুরু হয়, কোনটা গলাধঃকরণ না করা পর্যন্ত টের পাওয়া যায়না, কোনটা জিহ্বার আগায় জ্বালা ধরিয়ে দেয়, কোনটা আবার সমস্ত মুখগহবরে আগুন। মরিচ মুখে দেয়ার পর আমাদের...
  • জলপাই এর নানান পদ

    শীত মৌসুমে যে কয়টি ফল দেখা যায় তার মধ্যে জলপাই একটি।জলপাইয়ের প্রতি চাহিদা বেড়েই চলছে। বাজারে গেলে সবাই জলপাই ক্রয় করবেই। কন কনে শীতে সবাই চায় একটু টক। জলপাই শুধু খেতেই সুস্বাদু নয়। নিয়মিত জলপাই খেলে পেতে পারেন এমন সব উপকারিতা যেগুলো প্রতিটি স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ চায়। জলপাই খেলে বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য…

Leave a Reply